
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এখন আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। গাবতলী পশুর হাট থেকে শুরু করে বনানীর বোরাক টাওয়ার পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি নিয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধানের পর অবশেষে দুদক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজকে তলব করেছে। নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন হিযবুত তাহরীর-এর সাথে তার পুরনো সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিল এমন সন্দেহসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার করেছে দুদক।
দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়েছে যে আগামী ২৯ জানুয়ারি সকাল ১০টায় সেগুনবাগিচা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রশাসক এজাজকে এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দুর্নীতির নেটওয়ার্কে প্রশাসক একা নন। ডিএনসিসির ভেতরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে যে সকল বড় টেন্ডার, অবৈধ নির্মাণ অনুমোদন, দোকান বরাদ্দ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বিল ছাড়ের ব্যাকডোর প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন। প্রকৌশল বিভাগ তার নেতৃত্বে একধরনের অপ্রকাশ্য ‘প্রভাবশালী বাণিজ্য কেন্দ্র’-এ পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ মিলেছে।
গাবতলী পশুর হাটের ইজারা অনিয়ম ও সরকারি রাজস্ব ক্ষতি, বোরাক টাওয়ারের শেয়ার দখল নিয়ে বিতর্ক, ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার, কাঁচাবাজারের দোকান বরাদ্দে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং খিলগাঁও তালতলায় পার্কিংয়ের জায়গায় নকশা বহির্ভূত দোকান তৈরি—সব ধরনের অনিয়মের ফাইলে প্রশাসকের অনুমোদন থাকলেও বাস্তব কাজে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে যে ঠিকাদারদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কমিশন আদায়ের একটি সিন্ডিকেট তিনি গড়ে তুলেছেন, যা প্রশাসক এজাজের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে পরিচালিত হয়।
এজাজের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে তার পুরনো রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে। বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং গণমাধ্যমের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে তিনি নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং অতীতে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে গণঅধিকার পরিষদের এক নেতা প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে প্রশাসক পদে বসে তিনি নিষিদ্ধ সংগঠনের নানা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। এতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে সরকারি সম্পদ ও প্রকল্প থেকে লুটপাট হওয়া অর্থ কোনো উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হচ্ছে কিনা।
সুশীল সমাজ এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধুমাত্র প্রশাসককে তলব করলেই ডিএনসিসির দুর্নীতির মূল শিকড় ধরা যাবে না। প্রকৌশল বিভাগ থেকে শুরু করে টেন্ডার অনুমোদন ও অর্থ লোপাটের পুরো কাঠামো তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তারা মনে করেন যে কাগজে-কলমে ব্যক্তি বদলালেও সিন্ডিকেট অপরিবর্তিত থাকলে দুর্নীতি ও লুটপাট থামবে না। তাই প্রশাসক এজাজের পাশাপাশি প্রধান প্রকৌশলী মঈন উদ্দিনকে তদন্তের আওতায় এনে পুরো দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া জরুরি বলে তাঁরা মনে করেন।